একুশে ফেব্রুয়ারী
অনুপ মুখোপাধ্যায়, দিল্লী
একুশে ফেব্রুয়ারী,
পৃথিবীর যাযাবর মানুষের জন্য একটা দিন ধার্য করা হল, পৃথিবীর মানুষের সব থেকে প্রিয়
যা হওয়া উচিৎ, সেই ভাষা যাতে তার বংশের পূর্বসূরিরা কথা বলে এসেছে, সেই ভাষা কে গর্ব
করে নিজের ভাষা বলার অধিকার টা যখন পৃথিবীর সব থেকে বড় আন্তর্জাতিক সংগঠন “অধিকার”
বলে মেনে নিল, সেই দিন টা হল – একুশে ফেব্রুয়ারী। এই দিন টি বাঙ্গালির কাছে অত্যন্ত
প্রিয়, ভালোবাসার, গর্ব করার, আর অঙ্গীকার করার দিন যে।
এই দিনের ইতিহাস
নিয়ে কিছু বলতে চাইনা। ইন্টারনেট এ সবাই দেখে নিতে পারেন। শুধু এই দিন টি যে না, বাংলা
ভাষা কে ভালবেসে, নিজের মাতৃ ভাষা তে কথা বলার অধিকার স্থাপিত করতে বাঙ্গালী এক বার
না, বার বার প্রাণ দিয়েছে, সে ইতিহাস ও অনেকের জানা। আমাদের ভাইএর রক্তে রাঙ্গা এই
দিন, বা উনিশে মে, আমরা মঞ্চ থেকে গান গেয়ে, ভাষণ দিয়ে, চা জলখাবার খেয়ে, নিজেদের স্ব
স্ব কাজে মেতে গেলেই কি ‘কর্তব্য’ সারা হয়ে যায়?
কোন সমস্যার সাথে
যুঝতে হলে, সর্বপ্রথম দরকার সেই সমস্যা টা কে ঠিক মতন করে চেনা আর পরিভাষিত করা। আজ
শুধু বাংলা না, বিশেষ করে ভারত বর্ষের মতন বহু ভাষা – ভাষী দেশ এ আগামী জন্মের সন্তান
দের মাতৃ ভাষার শিক্ষা শুধু না, মাতৃ ভাষা টা কে ধরে থাকা টাও বিরাট ব্যাপার হয়ে গেছে।
তার জন্য ভারত সরকার কে দোষ দেওয়া, যে রাজ্যে বাস করি সেই রাজ্য সরকার কে দোষ দেওয়া,
আর টেলিভিশান কে দোষ দেওয়া সহজ কাজ। আর একটা সহজ কাজ হল যে আমরা যারা খেটে খেতে দেশ
ছাড়া হয়েছি, আর বাম পন্থী মানসিকতা তে কথা বলা টা সহজ মনে করি, তারা হিন্দী, ইংরাজি,
কে সহজে ‘সাম্রাজ্যবাদী ভাষা’ আক্ষান দিয়ে, নিজেদের সন্তান অথবা নাতি নাতনি কে ইংরাজি
স্কুল এ পাঠিয়ে ‘দুনিয়ার সব … এক হও’ বলে টেলিভিশান এ সিরিয়াল দেখতে বসে যাই।
সমস্যার অনেক মাত্রা নিয়ে মতের পার্থক্য থাকতে পারে,
সেগুলো নিয়ে আলোচনা হওয়া দরকার। আমার মতে, সব থেকে বড় কারণ হল আর্থিক চাপ! যে সমাজ
অর্থের দিক দিয়ে স্বাধীন, সেই সমাজ কিন্তু নিজের ভাষা টা কে ধরে রেখেছে। আমরা সবাই
জানি সুদুর মাড়ওয়ার থেকে অনেকে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল ২০০-২৫০ বছর আগে, বা তার ও হয়তো
আগে, তাদের প্রতিটা সন্তান আজ ও নিজেদের ভাষায় কথা বলে। আর বাঙ্গালীরা যারা ৫০-৭৫ বছর
আগে বাংলা ছেড়ে বেরিয়েছে, তাদের বাচ্ছারা ‘হাঁটু’ বা ‘কনুই’ জানেনা, তারা ‘knee’ বা
‘elbow’ জানে, তারা ঘুটনা বা কোহনী জানে, অথচ তাদের কে বার বার বলতে শুনেছি ‘পায়ের
হাঁটু তে লেগেছে’ অথবা ‘গির গিয়ে হাতের হাঁটু তে খুন এসেছে।‘
ভাষা আর শিক্ষা,
এ দুটো যখনই রোজগার আর চাকরির সাথে যুক্ত হয়েছে, তখনই ভাষার দরকার ফুরিয়েছে। তিন-ভাষা
তে শিক্ষা দেশের আইনে আছে, কিন্তু সেটা কি সম্ভব? দিল্লী শহরে বাংলা স্কুল আছে, দিল্লীর
প্রায় ১৫ -২০ লাখ বাঙ্গালী বাসিন্দার কতজনের সন্তান রা সেই বাংলা স্কুল গুলো তে যায়?
আর অন্য সরকারি বা বেসরকারি স্কুল এ যেখানে ৩০-৩৫ টা ছাত্রের ভেতর প্রতি ক্লাসে দুটো
করে বাঙ্গালী যদি থাকে, তো কোন স্কুলের পক্ষেই সম্ভব না স্কুলে বাংলা শিক্ষা দেওয়া।
দ্বিতীয়, পাঞ্জাব,
হিমাচল, হারিয়ানা, গুজরাত, কেরালা, ইত্যাদি বহু রাজ্যে বাঙ্গালী আছে কিন্তু বাংলা স্কুল
নেই। আমাদের বাড়ির ছাত্র-ছাত্রী দের সেই পাঞ্জাবি-হিমাচালি-হারিয়ানি-গুজরাটি র সাথে
মানসিক পাঞ্জা লড়াই এ থাকতে হয়ে, এখনকার সময় এগিয়ে যাবার, অন্য থেকে এগিয়ে যাবার দিন,
সেই প্রতিযোগিতায় বাচ্ছারা প্রাথমিক-প্রাক-প্রাথমিক থেকেই মেতে আছে, আমরাই তাদের কে
লেলিয়ে দিয়েছি, ‘তোকে এগিয়ে থাকতে হবে।‘
কাজেই, আমরা যদি
মনে করি যে বাংলা ভাষা টা আমাদের পরিচয়, আমাদের গর্ব, তো সেই ‘পরিচয় আর গর্ব’ ভাবনা
টা ঢোকাতে হবে, যাকে ইংরাজি তে বলে, ‘we have to inject the feeling of identity
and proud for language’।
আমরা যারা বাংলা
পড়তে, লিখতে, বুঝতে পারি, আমাদের কর্তব্য হল ছোটোদের সামনে বাংলা পড়ার, বাংলা লেখার।
আমি বা আমরা ভাই বোনেরা কেউও বাংলা ভাষা টা স্কুল এ পড়িনি। আমাদের অক্ষর পরিচয় বাড়িতেই। আমাদের মতন অনেক আছে,
যারা বাংলা স্কুলে পড়েনি, অথচ বাংলা জানে। অনেকে লিখতে পারেনা, আবার কিছু আছে যারা
পড়তে লিখতে পারেনা, যদিও অক্ষর পরিচয় টা আছে। কিন্তু কথা বার্তা তে বাঙ্গালী । আমাদের
বড়রা আমাদের সঙ্গে কখনই হিন্দী বা ইংরাজি তে কথা বলত না, কিন্তু আমরা ছোটদের সাথে বলি,
কেন?
ক’দিন আগে শুনলাম,
“বেবি, তুমি লিপ্স অয়াইপ করে নাও, ফিঙ্গারস ক্লীন করে নাও, তোমার চীক্স গুলো ডরটি হয়ে
গেছে”। আজ দরকার এই ভাষা না ব্যাবহার করে আমরা সোজা ভাষায় বলি, ‘সোনা আমার, ঠোঁট আর
আঙ্গুল পুঁছে নাও, তোমার গাল গুলো নোংরা হয়ে গেছে’।
দরকার, বাড়িতে বাংলা
বলুন, শুনুন, পড়ুন, দেখুন। সন্তানের প্রথম শিক্ষা স্থান হল বাড়ি, শিক্ষা টা বাড়ি থেকে
শুরু করুন। তাকে গর্ব করতে সেখান, নিজের ভাষা, নিজের পদবী। আসুন, এগিয়ে যাই । শেষ করার
আগে একটি কথা, শুধু বাংলা ভাষা না, পরিব্রাজক জনসংখ্যা যত বাড়বে, তাদের ভাষা নিয়ে প্রশ্ন
উঠবেই।
No comments:
Post a Comment