রাজা রাম মোহন রায়

 


রাজা রামমোহন রায়

সংকলন- অনুপ মুখোপাধ্যায় “সাগর”

 

জন্ম মে ২২, ১৭৭২, রাধানগর, বাংলা, মৃত্যু- সেপ্টেম্বর ২৭, ১৮৩৩, ব্রিস্টল, ইংল্যান্ড

 

নবজাগরণ মানেই রাজা রামমোহন রায়। তিনি শুধু একজন সমাজ সংস্কারক ছিলেন না, ছিলেন একাধারে চিন্তাবিদ, শিক্ষাবিদ, ধর্ম সংস্কারক এবং মানবাধিকারের জ্বলন্ত মশাল। আঠারো শতকের ভারতীয় সমাজে যখন অন্ধকার কুসংস্কার, অমানবিক প্রথা এবং গোঁড়ামি প্রাধান্য বিস্তার করেছিল, তখনই তিনি নতুন যুগের সূচনা করেছিলেন।  রাজা রামমোহন রায় সতীদাহ প্রথা বিলোপ থেকে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসারে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন। ভারতীয় নবজাগরণের অগ্রদূতের জীবন ও কাজ আধুনিক প্রজন্মকেও অবাক করবে।  শৈশবেই রামমোহন পাটনায় গিয়ে আরবি ও ফারসি ভাষায় পারদর্শিতা অর্জন করেন। পরে কাশীতে গিয়ে সংস্কৃত ও বেদান্ত শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। আশ্চর্যের বিষয়, মাত্র ২৩ বছর বয়সে তিনি প্রায় ১০টি ভাষায় দক্ষ হয়ে ওঠেন। এই জ্ঞানপিপাসাই তাঁকে একদিকে পাশ্চাত্যের আধুনিক শিক্ষা, অন্যদিকে ভারতীয় দর্শনের গভীর চিন্তায় অভ্যস্ত করে তোলে।

 

রামমোহন রায় সবচেয়ে বেশি পরিচিত সতীদাহ প্রথা বিলোপের জন্য। সে সময় বিধবাদের স্বামীর চিতায় আত্মাহুতি দিতে বাধ্য করা হত। এই অমানবিক প্রথার বিরুদ্ধে তিনি জনমত গড়ে তোলেন এবং ১৮২৯ সালে লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক-এর সহযোগিতায় সতীদাহ প্রথা আইনত নিষিদ্ধ হয়। এছাড়া তিনি বাল্যবিবাহ, কন্যাপণ এবং কুসংস্কারের বিরুদ্ধেও আন্দোলন করেছিলেন।

 

তিনি মূর্তিপূজার বিরোধী ছিলেন এবং একেশ্বরবাদের প্রচার করেছিলেন। উপনিষদের যুক্তি ও বেদান্ত দর্শনের আলোকে তিনি নিরাকার ব্রহ্মের উপাসনার কথা বলেছিলেন। ১৮২৮ সালে তিনি ব্রাহ্মসভা প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তীতে ব্রাহ্মসমাজে পরিণত হয়। এর মাধ্যমে তিনি হিন্দুধর্মের ভেতর সংস্কার ও যুক্তিবাদী চেতনার বিস্তার ঘটান।

 

পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রচারে রামমোহন ছিলেন অগ্রণী। তিনি বিশ্বাস করতেন যে আধুনিক শিক্ষা, বিজ্ঞান এবং যুক্তিবাদই জাতিকে কুসংস্কারমুক্ত করবে। ডেভিড হেয়ারের সহযোগিতায় তিনি বহু স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি একটি অ্যাংলো-হিন্দু স্কুল গড়ে তোলেন এবং মেয়েদের শিক্ষার ক্ষেত্রেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

রামমোহন ছিলেন প্রথিতযশা লেখক ও সাংবাদিক। তিনি বাংলায় ‘ব্রাহ্মণ পত্রিকা’ এবং ইংরেজিতে ‘ইস্ট ইন্ডিয়া গেজেট’ প্রকাশ করেন। সমাজ সংস্কার ও ধর্মীয় চিন্তাধারা প্রচারের জন্য তিনি একাধিক গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর লেখনী সমাজে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।

মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় আকবর তাঁকে ‘রাজা’ উপাধি দেন এবং ইংল্যান্ডে পাঠান। সেখানে তিনি সতীদাহ প্রথা বিলোপের পক্ষে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বক্তব্য রাখেন এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চার্টার পুনর্নবীকরণের সময় উপস্থিত ছিলেন। ১৮৩৩ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর তিনি ব্রিস্টল শহরে মৃত্যুবরণ করেন এবং সেখানেই তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়।

 

রামমোহন রায়কে শুধু একজন সংস্কারক বলা যথেষ্ট নয়। তিনি আধুনিকঅনুপ ভারতের নবজাগরণের পথিকৃৎ। সতীদাহ প্রথা বিলোপ, নারী শিক্ষার প্রসার, একেশ্বরবাদের প্রচার ও পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসারে তাঁর অবদান ভারতকে নতুন যুগে প্রবেশ করিয়েছিল। আজও তিনি 'ভারতীয় নবজাগরণের অগ্রদূত' হিসেবে স্মরণীয়।

                         

রাজা রামমোহন রায় ছিলেন সেই মানুষ, যিনি অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজে আলোর দিশা দেখিয়েছিলেন। নারী অধিকার, শিক্ষা, মানবতা এবং যুক্তিবাদের পক্ষে তাঁর সংগ্রাম আজও প্রাসঙ্গিক। ভারতীয় সমাজ যদি আধুনিকতার পথে অগ্রসর হয়, তবে তার কৃতিত্ব নিঃসন্দেহে এই মহামানবের। উনি ভারতের প্রাচিন সংস্কৃত গ্রন্থ, যেমন বেদ, উপনিশদ ইত্যাদির  ইংরাজি ভাষায় অনুবাদ করেন। ওনার এই রচনার কেন্দ্র বিন্দু ছিল ইশ্বর, যিনি মানুষের জানা অজানার ওপরে, যিনি এই সৌরমণ্ডল এর রচনাকার, তার উপাসনা। ওনার অনুবাদের প্রশস্তি হিসেবে ফ্রান্স ১৮২৪ এ ওনাকে  The central French Société Asiatique in 1824’এর সদস্য মনোনীত করা হয়। 

 

উনি ক্রিস্তান ধর্ম তেও রুচি দেখান আর তার ব্যপারে জানার জন্য হিব্রু আর গ্রীক ভাষা শেখেন। ১৮২০ সালে উনি Precepts of Jesus, the Guide to Peace and Happiness প্রকাশিত করেন। ১৮২২ সালে রাজা অ্যাংলো হিন্দু স্কুল আর ১৮২৬ সালে বেদান্ত কলেজের স্থাপনা করেন। অগাস্ট ১৮২৮ এ ব্রাহ্ম সমাজ এর স্থাপনা করেন।  ১৮২৯ সালে  উনি দিল্লীর রাজার প্রতিনিধি হয়ে বিলেত যাত্রা করেন।

 

 অনুপ মুখোপাধ্যায় "সাগর"

No comments:

Post a Comment